রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ন
আরিফুল ইসলাম, সালথা (ফরিদপুর) থেকেঃ
ফরিদপুরের সালথায় স্বঘোষিত শিক্ষক নেতা সাহেবুলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থীকে যৌন নিপিড়ন, সেই ঘটনায় জেলে থাকাকালিন সময়ের বেতন উত্তোলন, পাঠদান না করে উপজেলা সদরে ঘোরাঘুরি, নিয়মিত বিদ্যালয়ের শ্রেনী কক্ষে প্রাইভেট পড়ানো, বিভিন্ন অজুহাতে ( বেতন সমতাকরণ ও বকেয়া প্রাপ্তি, স্লীপ ফান্ড, ওয়াশ ব্লক মেরামত, রুটিন মেরামত ) শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ, বিদ্যালয়ের পুরাতন ঘরের মালামাল বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ, নিজেকে রাজনৈতিক দলের নেতা দাবি করা, স্বেচ্ছাচারী হয়ে তার মতের বিরোধী শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ, হুমকী ধামকী ও ভয় ভিতি প্রদর্শন সহ তার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। আর দিন দিন এই অনিয়ম ও দূর্নীতি বেড়েই চলছে। স্বঘোষিত শিক্ষক নেতা সাহেবুল ইসলাম উপজেলার ১২ নং সিংহপ্রতাপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও নটখোলা গ্রামের বাসিন্দা।
জানা যায়, মো. শাহেবুল ইসলাম ২০০৯ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরিচয়ে তিনি একজন শিক্ষক, তবে তার আচরণ কর্মকাণ্ড কোন কিছুতেই তা মনে হয় না। সকাল বেলা বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রাইভেট পড়ান, এরপর হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। কোনদিন একটি ক্লাস করেন অথবা কোনদিন করেন না, এরপর শিক্ষা অফিসের কথা বলে চলে আসেন উপজেলা সদরে। উপজেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা হিসাব রক্ষন অফিস ঘুরে চলে আসেন চায়ের দোকানে। সেখানে চা আর সিগারেটে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে চলে তার দেন দরবার। ফেসবুকে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতা ও অফিসারদের সাথে ছবি তুলে নিজেকে মহা শক্তিধর লোক হিসেবে প্রদর্শন করেন।
শাহেবুল ইসলাম নটখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সময় ২০১৪ সালে মেয়ের বয়েসি ৪র্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষন চেষ্টা কালে হাতে নাতে ধরা পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়। ঐ ছাত্রীর মাতা থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ শাহেবুল কে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠায়। এরপর ১৫ দিন হাজত বাস শেষে আওয়ামী মধ্যস্থতায় জেল থেকে বের হন। নিয়ম অনুসারে কোন কর্মচারী জেলে থাকা অবস্থায় তার বেতন পাবে না এবং তা সার্ভিস বুকে লিপিবদ্ধ থাকবে। তবে ঐ সময় আওয়ামী প্রভাব খাটিয়ে তিনি সকল বেতন ভাতা তুলে নেন এবং সার্ভিস বুকে তা লিপিবদ্ধ করতে বাধা দেন। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে চরম ক্ষোভ দেখা যায়। এমনি একজন শিক্ষার্থীকে বলৎকারের ঘটনাও টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেন তিনি।
ছাত্রীকে ধর্ষন চেষ্টার ঘটনার পর শাহেবুল কে সিংহপ্রতাপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। তার স্ত্রী সহকারী শিক্ষক তাইফুন নাহার কে সিংহপ্রতাপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করিয়ে আনেন। এরপর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সকল কমিটিতে পদধারী ছিলেন। তবে তিনি বর্তমানে নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের একনিষ্ঠ কর্মী দাবি করলেও বিগত ৫ আগষ্টের আগে ছিলো ভিন্ন চিত্র। বর্তমানে কয়েকজন সুবিধাবাদী শিক্ষক কে নিয়ে একটি পকেট কমিটি করে সেখানে শাহেবুল নিজেকে শীর্ষ পদে রেখেছেন বলে বিভিন্ন সময়ে প্রচার করেন।
২০২৩ সালে সিংহপ্রতাপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি পুরাতন ঘর নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়। ঐ সময় তিনি আওয়ামী প্রভাব খাটিয়ে পুরাতন ঘরের সমস্ত মালামাল বিক্রি করে দেন। বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকদের মাঝে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। এমনকি শিক্ষকদের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়ান। সরকারি বিধি নিষেধ না মেনে তিনি এবং তার স্ত্রী তাইফুন নাহার নিয়মিত বিদ্যালয়ের শ্রেনী কক্ষে প্রাইভেট পড়ান। তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কক্ষ থেকে বের করে দেন। প্রাইভেট পড়ানোর সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে অশোভন আচরণ করেন এবং অনেক সময় কুপ্রস্তাব দেন। ছাত্র বলৎকারের মত নিকৃষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক শাহেবুল ইসলাম সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন। একটি মহল আমাকে ফাঁসানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। শিক্ষার্থীকে যৌন নিপিড়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সেটিও আমাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছিলো। অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে বিজ্ঞ আদালত ১৫ দিন কারাবরণের পর আমাকে মুক্তি দিয়েছিলেন। বিগত দিনে যারা টাকা আত্মসাৎ করেছে, তারাই আমার বিরুদ্ধে এসব করছে। তাদের প্রশাসন কেন জানি দেখে না। আমি চাই সব দুর্নীতি জনগণের সামনে আসুক, সালথা কলঙ্কমুক্ত হোক।
এই বিষয়ে সিংহপ্রতাপ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তার কে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই। সহকারী শিক্ষা অফিসার মোহাম্মাদ হাফিজুর রহমান বলেন, যারযার দায়িত্ব সেই সেই পালন করুক, কেউ প্রতিহিংসা পরায়ণ না হোক। আমরা চেষ্টা করছি সাহেবুল সহ সবাই স্কুলে ফিরে যাক।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. তাশেমউদ্দিন বলেন, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে উপজেলা সদরে ঘোরাঘুরি এটা শুধু এই উপজেলাতে দেখলাম অন্য কোথাও চোখে পড়ে নাই। আমি অনেক শিক্ষককে নিষেধ করেছি, কিন্তু মাঝে মাঝে নিরুপায় হয়ে যাই। সাহেবুল ইসলামের সকল অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।